নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে (নাসিক) পরিবেশবান্ধব, আধুনিক ও জলবায়ু সহনশীল নগর সেবা নিশ্চিত করতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ১১ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এনজিআরইউডিপি)’ নামে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন গত ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এডিবির ফিলিপাইনের ম্যানিলা সদরদপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এই প্রকল্পের লোন এবং প্রজেক্ট এগ্রিমেন্ট চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে।
পটভূমি ও বাস্তবায়নের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
প্রকল্পটির প্রশাসনিক যাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৫ সালের 6 ডিসেম্বর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একনেক সভায় এই মেগা প্রকল্পটি নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার (বিএনপি সরকার) দায়িত্ব নেওয়ার পর, এই মেগা প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ও ঋণ চুক্তি এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই শুরু হচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে প্রকল্পটিকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ রাখা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে কাজ শেষ করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পের প্রশাসনিক অগ্রগতি ও অফিসিয়াল টাইমলাইন
এডিবির অফিশিয়াল নথিপত্র ও তথ্যানুযায়ী, এই মেগা প্রকল্পের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়াটি একটি সুনির্দিষ্ট টাইমলাইনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়েছে:
জুলাই ২০২২: প্রাথমিক দারিদ্র্য ও সামাজিক মূল্যায়ন (Initial Poverty and Social Analysis) সম্পন্ন করার মাধ্যমে প্রকল্পের ধারণাপত্র তৈরি হয়।
মার্চ ২০২৬: এডিবির সভাপতির রিপোর্ট ও সুপারিশ (Report and Recommendation of the President), লিঙ্গ সমতা মূল্যায়ন ও কর্মপরিকল্পনা (Gender Assessment and Action Plan), সংগ্রহ পরিকল্পনা (Procurement Plan) এবং নাসিকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারিগরি সহায়তা রিপোর্ট চূড়ান্ত করা হয়।
এপ্রিল ২০২৬: এডিবি কর্তৃক প্রকল্পটির চূড়ান্ত ঋণ অনুমোদন এবং প্রকল্প প্রশাসন ম্যানুয়াল (Project Administration Manual) প্রকাশ করা হয়।
মে ২০২৬: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও এডিবির মধ্যে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত ‘লোন এগ্রিমেন্ট’ (Loan Agreement) এবং নাসিকের সাথে ‘প্রজেক্ট এগ্রিমেন্ট’ (Project Agreement) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়।
দৈনিক ১৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ ও পানির অপচয় ২০% এ নামানোর লক্ষ্য
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে দৈনিক ১১ কোটি ৩০ লাখ লিটার পানি সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে, যা এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাড়িয়ে ১৬ কোটি ২০ লাখ লিটারে উন্নীত করা হবে। এর জন্য নতুন টিউবওয়েল স্থাপন, বিদ্যমান গোদনাইল পানি শোধনাগার সংস্কার এবং পুরোনো কূপগুলোর উন্নয়ন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩৪ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রতিস্থাপন ও সম্প্রসারণ, মিটারযুক্ত সংযোগ চালু এবং ডিস্ট্রিক্ট মিটারড এরিয়া (ডিএমএ) পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে পানির অপচয় (নন-রেভিনিউ ওয়াটার) ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন (স্কার্ডা) প্রযুক্তি, অনলাইন বিলিং ও রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে।
খাল পুনরুদ্ধার ও ‘নেচার-বেজড’ ড্রেনেজে জলাবদ্ধতা মুক্তি
অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ও জলাধার দখলের কারণে নারায়ণগঞ্জে জলাবদ্ধতা এখন একটি স্থায়ী সমস্যা। এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে প্রায় ২২ কিলোমিটার ড্রেনেজ অবকাঠামো ‘নেচার-বেজড সল্যুশন’ (প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান) পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হবে, যা মাটির নিচে পানি ধারণক্ষমতা বাড়াবে ও জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, শীতলক্ষ্যা নদীর কোল ঘেঁষে সর্বোচ্চ ১৫ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হবে, যা বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি ও জলোচ্ছ্বাস থেকে শহরকে রক্ষা করতে 'বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ' হিসেবে কাজ করবে। এর পাশাপাশি সড়কের পাশে ২ হেক্টর জমিতে সবুজ উন্মুক্ত স্থান বা পার্ক গড়ে তোলা হবে, যা শহরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করবে।
ডিজিটালাইজেশন ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান
দ্রুত শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই প্রকল্পের আওতায় আগামী কয়েক দশকের উপযোগী করে নগর পরিকল্পনা, পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘমেয়াদি 'মাস্টারপ্ল্যান' প্রণয়ন করা হবে। এছাড়া নাসিকের অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে জিআইএস (GIS) ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স আধুনিকায়ন, অনলাইন বিজ্ঞাপন ট্যাক্স এবং প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা হবে।
সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ ও নাগরিক অধিকার
এই ১৪শ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টে যাতে কোনো ধরনের টেন্ডারবাজি, স্বজনপ্রীতি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা ধীরগতির নামে জনগণের অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি না হয়, সে ব্যাপারে নাসিক কর্তৃপক্ষ, প্রকল্প পরিচালক এবং বর্তমান সরকারকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানাই।
0 মন্তব্যসমূহ